পুরাকালে বারাণসিরাজ ব্রহ্মদত্তের রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব পায়রারূপে জন্মগ্রহণ করেন। তখন বারাণসির লোকেরা পুণ্য কামনায় পাখিদের সেবা করত। পাখিদের জন্য ঘরের বাইরে ও ভিতরে নানা জায়গায় ঝুড়ি ঝুলিয়ে রাখত। পায়রারূপী বোধিসত্ত্ব সে রকম একটি ঝুড়িতে রাতে থাকতেন। সেখান থেকে প্রতিদিন সকালে খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়তেন। খাবার খেয়ে সন্ধ্যার সময় সেই ঝুড়িতে এসে শয়ন করতেন।
একদিন এক কাক সেই ঘরের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় রান্নার চমৎকার গন্ধ পেল। সে উঁকি দিয়ে দেখল ভিতরে মাছ-মাংস রান্না হচ্ছে। লোভী কাক বাইরে বসে ভাবতে লাগল, কেমন করে ঐ মাছ-মাংস খাওয়া যায়। সন্ধ্যার সময় পায়রাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখে ভাবল, পায়রাটার সঙ্গে ভাব করেই উদ্দেশ্য সফল করতে হবে।
পরদিন ভোরে বোধিসত্ত্ব ঘুম থেকে উঠে খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন। কাকও তাঁর পেছন পেছন ছুটল। বোধিসত্ত্ব বললেন, 'তুমি আমার সঙ্গে চললে কেন?' কাক বলল, 'আপনার চালচলন আমার খুব ভালো - লাগছে। আমি এখন থেকে আপনার অনুচর হয়ে থাকব।'

তারপর থেকে কাকটি বোধিসত্ত্বের সঙ্গে থাকতে লাগল। পাচক দেখল, পায়রার সঙ্গে একটি কাক এসে থাকছে। তাই সে কাকের জন্যও একটি ঝুড়ি ঝুলিয়ে দিল। সেই থেকে কাকটিও সেই বাড়িতে থাকতে লাগল। একদিন শ্রেষ্ঠীর বাড়িতে প্রচুর মাছ-মাংস রান্না হচ্ছিল। তা দেখে কাকের খুব লোভ হলো। সে ঠিক করল পরদিন সে খাবার খুঁজতে বাইরে যাবে না। এই ভেবে সে সারা রাত অসুস্থতার ভান করে পড়ে রইল। সকালে সে ঠিক করল, পায়রার সঙ্গে খাবার খেতে বাইরে যাবে না। বোধিসত্ত্বের মনে সন্দেহ হলো। তাই তিনি কাককে বললেন, 'বেশ, তুমি থাকো। তবে সাবধান লোভে পড়ে কোনো কিছু করে বসো না।' কাককে উপদেশ দিয়ে বোধিসত্ত্ব নিজের খাবার খুঁজতে চলে গেলেন।
এদিকে পাচক রান্না শুরু করল। রান্নার হাঁড়ি থেকে বাষ্প বেরোনোর জন্য হাঁড়ির মুখ একটু খোলা রাখল। একটা হাঁড়ির মুখ ঝাঁঝরি দিয়ে ঢেকে দিল। রান্নার সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এ সময় পাচক গায়ের ঘাম শুকানোর জন্য রান্নাঘরের বাইরে বারান্দায় গেল। কাক ঠিক সে সময় ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁড়ির ওপর ঝাঁঝরিতে গিয়ে বসল। তখনই ঝাঁঝরিটা মাটিতে পড়ে ঝন্ঝন্ শব্দ হলো। পাচক সেই শব্দ শুনে রান্নাঘরে ছুটে এল।
এসে দেখল, কাক মাংস খাওয়ার চেষ্টা করছে। পাচক সঙ্গে সঙ্গে ধূর্ত কাকের উদ্দেশ্য বুঝতে পারল। সে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কাকটিকে ধরে ফেলল। এরপর সারা শরীরের পালক তুলে নিয়ে গায়ে আদা ও নুন মেখে দিল। তারপর তাকে ঝুড়ির মধ্যে ফেলে রাখল। যন্ত্রণায় কাক ছটফট করতে লাগল।
বোধিসত্ত্ব সন্ধ্যায় ফিরে এসে কাককে দেখে সব বুঝতে পারলেন। তখন তিনি ভাবলেন, লোভী কাক আমার কথা না শোনায় এই ফল পেয়েছে। তারপর তিনি একটি গাথা বললেন। গাথাটির অর্থ হলো:
'উপকারী বন্ধুর কথা স্বেচ্ছাচারীরা শোনে না। এ জন্য তার ওপর বিপদ নেমে আসে। কাক তার প্রমাণ।'
বোধিসত্ত্ব এই গাথা আবৃত্তি করে নিজে নিজে বললেন, আমি আর এখানে থাকতে পারি না। তারপর তিনি সেখান থেকে অন্য জায়গায় চলে গেলেন।
কাক সঙ্গে সঙ্গে মরে গেল। পাচক ঝুড়িসহ কাকটি ফেলে দিল।
উপদেশ: লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more